সবার আড়ালে কুষ্টিয়ার হাসান মীর




বিধান চন্দ্র রায় ।। এটাই কি স্বাভাবিক যে, আমাদের গুণী মানুষগুলোকে তাঁদের জীবদ্দশায় আমরা তেমন করে ধরে রাখতে পারি না? এই সমাজে অনেকে আছেন – যারা মানুষকে পড়তে জানেন না। আমরা শুধু সমালোচনা করতে জানি।





সহযোগিতা করা দূরে করার কথা, পাশের গুণী মানুষটিকে আমরা নানা কৌশলে দাবিয়ে রাখি। তাঁর সৃজনশিল্পকে মাটিচাপা দিতেও আমরা কুণ্ঠা বোধ করি না। প্রশ্ন ওঠে, সময়টা কি বরাবরই এরকম যেতে থাকবে, নাকি বদলাবে কোনোদিন? এর উত্তর আমার জানা নেই।

তবে আশা করি, সময়ের বুক চিরে আবার যদি আলোর রেখা ভাস্বর হয়ে ওঠে – সেদিন এই সমাজ নিশ্চয়ই জেগে উঠবে, সেদিন হয়তো আর কোনো গুণী মানুষ বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবেন না। পাশাপাশি এমনও দেখা যায়, কোনো কোনো গুণী মানুষ আছেন – যাঁরা আড়ালে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তাঁরা তাদের আপন ভুবনের স্বপ্নময় ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসতে চান না। আমাদের প্রিয় মানুষ জনাব হাসান মীর সেরকমই একজন। আজ তিনি কীভাবে একা একা শুয়ে-বসে থাকেন, নাকি দাঁড়াতে চাইলেও দাঁড়াতে পারেন না….সেদিকে নাহয় নাই-বা গেলাম! হৃদয় খুঁড়ে কেউই বেদনা জাগাতে চান না। আমিও চাই না।

স্বীকার করবো, জীবনের অসংখ্য ঘাত-প্রতিঘাতে জর্জরিত হয়েও আমাদের হাসান মীর জরাগ্রস্ত হয়ে পড়েননি। মনের দিক থেকে তিনি এতোটুকুও ক্ষয়ে যাননি। বরং বিরুদ্ধ প্রকৃতির ঝড়ো ময়দান থেকে জয় করে আনা চকচকে কলমটি তিনি আরও অধিক শাণিত করেছেন। তাঁর প্রতিটি লেখা মেদহীন। অথচ ভিন্ন মাত্রার শিল্পরস আর তথ্য-উপাত্তে ভরা সেই লেখাগুলো আকর্ষণীয় ও সমৃদ্ধ। তাঁর লেখার ধরন একেবারেই পৃথক ঢঙের। তাঁর লেখা পড়তে গেলে শেষ না করে পাঠকের উপায় থাকে না। গদ্যেও যে ছন্দ থাকে, তাল থাকে, মাত্রা থাকে সেটা হাসান মীরের লেখা পড়লে বোঝা যায়। তাঁর লেখা বই রয়েছে বেশ কয়েকখানা : চেনা-অচেনা, কাঁচের খরগোস, জাপানী লোককথা, হিরোশিমা-নাগাসাকি, প্রাচীন জাপানী গল্প, কালোবৃষ্টি, জাপানের রূপকথা ইত্যাদি।




আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে ১৯৮৩ থেকে চিনি ও জানি। তিনি তখন বাংলাদেশ বেতারের একজন কর্মকর্তা আর আমি তখন বেতারে খবর পড়ি। জানাশোনা এতোটুকুই। দীক্ষাগুরু চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে তিনি পরবর্তীতে আমার আপনজন হয়ে ওঠেন।

রুচিজ্ঞানসম্পন্ন এই মানুষটি জীবন সায়াহ্নে এসে অসুস্থ অবস্থায় শয্যাবন্দি হয়ে দিন পাড়ি দিচ্ছেন। তবুও ‘ঘাড়ত্যারা’ সেই প্রিয় মানুষটি আজও আগের মতোই নিজেকে ধরে রেখেছেন। ফেসবুকে অন্যান্য প্রসঙ্গের পাশাপাশি বাংলা ভাষার প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ নিয়ে লিখছেন তিনি। পাঠকের প্রগাঢ় ভালোবাসার দুনিয়াজোড়া মঞ্চে হাসান মীর আজ পরম শ্রদ্ধায় অভিষিক্ত হয়ে আছেন। অভিবাদন গ্রহণ করুন মীরভাই।

লেখক হাসান মীরের পোশাকি নাম মীর হাসান ইউনুস। জন্মসূত্রে কুষ্টিয়ার সন্তান। তাঁর জন্মসাল ১৯৪১ খ্রি.। তিনি বাংলাদেশ বেতারের অতিরিক্ত বার্তা নিয়ন্ত্রক ছিলেন। বর্তমানে তিনি অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। চাকরি করা অবস্থায় তিনি স্নাতক ও ভাষা-সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন।

চাকরির সুবাদে তিনি রেডিও জাপানের NHK-র ভাষাবিশেষজ্ঞ হিসেবে টোকিওতে বেশ ক’বছর কাজ করেছেন। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী হাসান মীর বাংলাদেশ বেতারে চাকরি করার আগে অনেক সেক্টরে কাজ করেছেন। বলে রাখা ভালো, পারিবারিক কারণে লেখাপড়া অসমাপ্ত রেখেই তিনি কর্মজীবন শুরু করেছিলেন তৎকালীন ইপিআরের সিগনালম্যান-সেপাই হিসেবে। এরপর ঠিকাদারের লেবার ও লেবার-সর্দার, ওয়ার্ক-অ্যাসিস্ট্যান্ট, বস্ত্রকলের শ্রমিক, লটারি কোম্পানির খাতা-লেখক এবং এক পর্যায়ে সরকারি অফিসের কেরানি হিসেবে তিনি কাজ করেছিলেন করাচিতে।

আমার অগ্রজতূল্য জনাব হাসান মীর বুকে পেসমেকার লাগিয়ে নিয়ে হৃৎযন্ত্রটাকে কোনোমতে সচল রেখেছেন। আমরা সকলে এই প্রিয় মানুষটির জন্য দোয়া করি। আমার বিশ্বাস তাঁর টাইমলাইনে থাকা লেখাগুলো সংগ্রহে নিলে কয়েক প্রস্থ মূল্যবান বই প্রকাশ করা সম্ভব হবে। বিশ্বাস করি, আজ হোক কাল হোক, এই কাজটি নিশ্চয়ই কেউ না কেউ করবেন। জীবনের ধন কোনোকিছুই যায় না ফেলা। আমরা সেই আশা নিয়েই বেঁচে আছি।

ভালো থাকবেন শ্রদ্ধাভাজনেষু।




সর্বশেষ সংবাদ

দৌলতপুরে জানাজা ছাড়াই নেচে-গেয়ে কিশোরের লাশ দাফন

ভয়েস অফ কুষ্টিয়া ।। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে জানাজা ছাড়াই নেচে-গেয়ে আঁখি (১৭) নামের এক কিশোরের মরদেহ দাফনের ঘটনা ঘটেছে। রোববার (১৬ মে) রাতে উপজেলার পশ্চিম-দক্ষিণ...

কুমারখালীতে ভাইয়ের আঘাতে ভাই ও ভাবি আহত

মিজানুর রহমান নয়ন ।। কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে জমি সংক্রান্তের জেরে সৎ ভাইয়ের আঘাতে সৎ ভাই ও ভাবি আহতের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার বিকেলে উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের...

ভেড়ামারায় মৎস্য খামারে বিষ প্রয়োগ

ভয়েস অফ কুষ্টিয়া ।। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় লিটনের মৎস্য খামারে বিষ দিয়ে মাছ নিধনের ঘটনা ঘটেছে। রবিবার ১৬ মে উপজেলার জুনিয়াদহ ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামে লিটনের...

ঈদ আনন্দ বাড়াতে কুমারখালীতে ঘুড়ি প্রতিযোগিতা

মিজানুর রহমান নয়ন ।। কেউ নাটাইয়ের সুতা ছাড়াচ্ছে, সুতা ছাড়ার তালেতালে কেউবা ঘুড়ি নিয়ে সুবিধামত দুরে যাচ্ছেন। আবার কেউ সেই ঘুড়ি আকাশে উড়িয়ে দিচ্ছেন।...
error: কপি করা যাবে না -ধন্যবাদ