কুষ্টিয়ার কৃতি সন্তান-আমাদের রাজু ভাই

বিধান চন্দ্র রায় ।। তিনি ইচ্ছে করলেই প্রশাসনিক ক্যাডার হতে পারতেন,হতে পারতেন ডি সি বা সচিব। ছয় ফুট এক ইঞ্চি উচ্চতা আর পয়তাল্লিশ ইঞ্চি বুকের ছাতি নিয়ে যোগ দিতে পারতেন সামরিক বাহিনীতে।কিন্তু তাঁর মনের মধ্যে তখন ঘুরছে শিল্পী হওয়ার অদম্য বাসনা। কুষ্টিয়া মুসলিম স্কুলের পড়া শেষ করে ভর্তি হলেন ঢাকা আর্ট কলেজে। সেখান থেকে ছুটে চললেন করাচী আর্ট কলেজ, মাইগ্রেশন নিয়ে ভর্তি হলেন ভাস্কর্য্য বিভাগে। করাচীতে বাংলা নাটক করে অবশ্য সারা ফেলেছিলেন। নাম ব্যবহার করতেন মাসুদ খান। পড়া শেষ করে দেশে ফেরার পর মাথায় ঘুরতে লাগলো সিনেমা। কার কাছে এ প্রেরণা পেয়েছিলেন তা তিনি কখনো প্রকাশ করেননি।

অভিনয় করতেন আগে থেকেই কুষ্টিয়ার বিভিন্ন মঞ্চে। নাট্যকার কল্যান মিত্র ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাঁর প্রেরণায় লিখতেন নাটক আর মঞ্চস্ত হতো। তাঁকে অনুকরণ করে রীতিমতো বিভিন্ন পাড়ায় নাট্য গোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল। সে সময় অনেকেই তাকে অনুকরণ করতো। পরবর্তীতে করাচী থেকে ফিরে এসে তিনি রওনা হলেন ঢাকায়, ব্যাস শুরু হলো সিনেমা। সিনেমায় অগ্রাধিকার পাওয়ার জন্য অনেকেই তাঁর নামের শেষ অংশ ব্যবহার করতেন।

কাঁচের স্বর্গ, অশান্ত ঢেউ,বাল্য বন্ধু,পদ্মা নদীর মাঝি,কাঁচ কাটা হীরে, মিশর কুমারী, স্মৃতি টুকু থাক,দুটি মন দুটি আশা,আমার জন্মভূমি, দস্যু রাণী, বাঘা বাঙালী, দুই পর্ব। জহির রায়হান পরিচালিত ‘জীবন থেকে নেওয়া’ ছবিতে তাঁর অভিনয় এখনো অনেকের স্মৃতি পটে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তিনি ঢাকার প্রায় সব শিল্পী দের সংগঠিত করে কুষ্টিয়ায় নিয়ে আসেন। মার্চ মাস জুড়ে আপেল মাহমুদ,আবদুল জব্বার সহ কুষ্টিয়ার অন্যান্য স্থানীয় শিল্পীদের রিকশা চড়ে এন এস রোড ঘুরে গনসঙ্গীতের অনুষ্ঠান কিংবা ইসলামিয়া কলেজের মাঠে অনুষ্ঠানের কথা হয়তো অনেকের মনে আছে। একটা গানের কথা বারবার মনে পড়েছে, ” বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে সেই জনতা”,সে সময় গীত হয়েছিল।

পরে এই সব শিল্পী দের একত্রিত করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র তৈরি হয়। সেখানে সারাদিন ধরেই উদ্দিপনা মূলক গান বাজতো। রবীন্দ্র সঙ্গীত,নজরুল গীতি, বিভিন্ন গীতিকার এর লেখা গান,আবৃত্তি হতো।চরমপত্র পাঠ করা হতো।নতুন নতুন সংবাদ থাকতো। থাকতো মুক্তি যুদ্ধের সাফল্যের খতিয়ান। কল্যান মিত্রের লেখা নাটক ‘জল্লাদের দরবার’ খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। এই নাটকের ইয়াহিয়া খানের কণ্ঠ রূপায়ণ করতেন রাজু আহমেদ। সে সময় তাঁর সঙ্গে আরো যাঁরা ছিলেন তাঁরা হচ্ছেন নারায়ণ ঘোষ মিতা,আজমল হুদা মিঠু, প্রসেনজিত বোস বাবুয়া,তরুন মহালনবিশ, ফিরোজ ইফতেখার, জহিরুল হক,বুলবুল মহালনবিশ, কল্যান মিত্র।

ঢাকায় ফিরে “জল্লাদের দরবার” চলচ্চিত্রে রূপায়ণের জন্য সরকারের অনুমোদন পেয়েছিলেন। মহরত হয়েছিল হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে। সেসময় অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেছিলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি তাজউদ্দীন আহমেদ। চলচ্চিত্র পরিচালনার কথা ছিল আবদুল্লাহ আল মামুনের।নাট্টকার কল্যান মিত্রকে নিয়ে অভিনেত্রী শিউলি আহমেদ এর বাসায় গিয়েছিলেন রাজুভাই চুক্তি পত্র সাক্ষর করতে, ১৯৭২ সালের ১১ ই ডিসেম্বর। সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে বেড়িয়ে মালিবাগের রাস্তায় তাঁরা আক্রান্ত হয়েছিলেন রিকশায় উঠার সাথে সাথেই।গুলিতে ঝাঁঝড়া হয়ে যায় ।

যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজু আহমেদ শিক্ষার প্রথম পাঠ নিয়েছিলেন, সেই কুষ্টিয়া মুসলিম হাই স্কুলের মাঠে তার জানাজা হয়েছিল ১৯৭২ সালের ১২ ডিসেম্বর, মৃত্যুর এক দিন পরে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে। অবশেষে তাকে মাহাতাব উদ্দীন সড়কে তাদের পারিবারিক গোরস্থানে সমাহিত করা হয়।

তাঁর পিতা লুৎফেল হক ছিলেন আইনজীবী ও সঙ্গীতজ্ঞ। মার নাম সখিনা খাতুন ডাক নাম পটলা। দাম্পত্য সঙ্গী ছিলেন নূরজাহান বেগম টুকু। তাঁরা উভয়ে ভালবেসে গাঁটছড়া বেঁধে ছিলেন ১৯৬৪ সালে।

এ দম্পতির তিন পুত্র সন্তান উজ্জল, কল্লোল, উৎপল। সন্তানেরা সবাই এখন বিশ্ব নাগরিক। বড়টি ফিলিপাইনের কন্যাকে বিয়ে করে সেদেশের স্হায়ী বাসিন্দা। মেজ ও ছোট দুজনেই আমেরিকার স্হায়ী বাসিন্দা। বিদেশি স্ত্রী নিয়ে ভালোই কাটছে তাদের ঘর সংসার।

তবে আফসোস একটাই,দেশ স্বাধীন হওয়ার পর গত পঞ্চাশ বছরে এই গুনী মুক্তিযোদ্ধা, অভিনেতা, সাংস্কৃতিক সংগঠক, চিত্র শিল্পী কোন স্বীকৃতি বা পুরস্কার পাননি!

আলোচিত খবর

error: কপি করা যাবে না -ধন্যবাদ