কুষ্টিয়ার কৃতি সন্তান হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় !

লেখকঃ বিধান চন্দ্র রায় (পরিচয়-পর্ব ১০)

2.01K Shares

ভয়েস অফ কুষ্টিয়া ।। এ কালের দেব কিংবা জিতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চুটিয়ে অভিনয় করছেন।বনেদী পরিবারের দাদুর ভূমিকায়, তাও এক পাঁড় মাতালের চরিত্রে । ছবির নাম খোকা ৪২০ । তখন তাঁর বয়স ৮৫/৮৬ বছর,চিন্তা করা যায় ! অভিনেতার নাম হারাধন বন্দ্যোপাধয়ায়, কুষ্টিয়ার মিলপাড়ার এককালের বাসিন্দা ।

১৯৪৮ সালে চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন ‘মেঘদূত’ ছবির মাধ্যমে। এ বাংলা ছবির পরিচালক ছিলেন অতনু বন্দ্যোপাধ্যায় । সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন এঁদের বহু ছবিতে তাঁর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

আকাশকুসুম, শত্রু, সোনার কেল্লা, পন্ডিত মশায়, নিয়তি, মহানগর, শ্যামসাহেব, কাপুরুষ, মায়াবিনী, সোনার খাঁচা, বরযাত্রী, লাল দরোজা, পথভোলা, জীবন নিয়ে খেলা, দেখা, মাইকেল মধুসূদন, কৈলাশে কেলেঙ্কারি, পরিণীতা, জয় বাবা ফেলুনাথ, আদরিনী, ক্রান্তিকাল, যদি জানতেম, মোমের আলো, কলকাতা-৪২০ । এ তালিকা শতকের উপরে হিন্দি সিনেমা । পরিণীতায় অভিনয় করে রীতিমতো সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন । আমন্ত্রণ, অনুরোধ পেয়েও হিন্দি সিনেমা খুব বেশি টানেনি তাকে। বাংলায় থাকতেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন ।

তিনি মঞ্চ কাঁপিয়েছেন সুদীর্ঘ সময় ধরে, নাটক করেছেন একটার পর একটা । অহিন্দ্র চৌধুরী, ছবি বিশ্বাস, উৎপল দত্ত সবার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মঞ্চে । টেলিভিশন সিরিয়াল, টেলিভিশন নাটক, বাংলা সিনেমা, হিন্দি সিনেমা সব জায়গায় ছিল তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য বিচরণ । অভিনয় করতে যেয়ে তাঁকে কতবার সাজতে হয়েছে পুলিশ অফিসার, জ্যাঠামশায়, বাবা, জেনারেল ম্যানেজার, ডাক্তার, নার্সিং হোমের মালিক, সরকারি উকিল, কমিটি মেম্বার, জমিদার, পন্ডিত মশায়, দাদু । সব চরিত্রে ছিল তার অনবদ্য পদচারণা ।

হারাধন বন্দোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৬ সালের ০৬ নভেম্বর কুষ্টিয়ার মিলপাড়ার রেললাইন এর ধারে বিশাল দোতলা লাল বাড়িটা এখনো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে । তাঁর আরেকভাই ঢাকা চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তিনি পরান বন্দ্যোপাধ্যায়,পরানবাবু নামে পরিচিত ছিলেন ।

কুষ্টিয়া মিউনিসিপ্যাল স্কুলে তার প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার শুরু।১৯৪৪ সালে এখান থেকে ম্যাট্রিকুলেশনপাশ করেন । ১৯৪৬ সালে পাশ করেন আই.এ. কলকাতা সিটি কলেজ থেকে । স্নাতক পড়াকালীন কর্ম জীবনে ঢুকে পরেন । প্রথম চাকরি ‘গান এন্ড শেল’ কোম্পানিতে । অভিনয়ের স্বার্থে পরে যুক্ত হন বীমা কোম্পানির সঙ্গে । সেখানেই যুক্ত ছিলেন আমৃত্যু ।

হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয় ২০১৩ সালের ০৫ই জানুয়ারি দুপুর ১২.৪০মিনিটে কলকাতায় । নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছিলেন একটি বেসরকারি নার্সিং হোমে।সেখানে পনের দিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করে অমৃতলোকের যাত্রি হন । মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। রেখে যান স্ত্রী, দুই পুত্র প্রসাদ ও কৌশিককে। আর অগুনিত ভক্ত, দর্শক, গুনগ্রাহী তো ছিলোই । এখনো টলিউডের অনেক শিল্পী, কলাকুশলী, অভিনেতা,পরিচালক তাঁর অভাব বোধ করেন ।

অভিনয় পারদর্শিতার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে সম্মানিত করেছেন “বঙ্গবিভূষণ” পদকে ২০১১ সালে। তিনি শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব চলচ্চিত্র অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন জাতীয় ভাবে ২০০৫ সালে। ১৯৬১ সালে পেয়েছেন উল্টো রথ ম্যাগাজিন কতৃক শ্রেষ্ঠ স্টেজ শিল্পীর পুরস্কার । তাছাড়া কলকার পুরস্কার পেয়েছেন ।

একটি কথা ছুটে গেছে, না বললে তাঁর জীবনের গল্পটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে তা হচ্ছে, বৃটিশ আমলে তাঁকে কারাগারে যেতে হয়েছিল বিপ্লবের কারনে, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অপরাধে ।

অভিনয় জগতে এখনো তাঁর উত্তরসূরী, ছেলে কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও বৌমা লাবনী সরকার দাপটের সঙ্গে টালিউড ফিলম্ এ অভিনয় করে যাচ্ছেন তাদের নিয়ে লিখবো অন্য কোন পর্বে ।

সূত্রঃ বিধান চন্দ্র রায় ।
সার্বিক সহযোগিতায়ঃ গোলাম মোস্তফা, কুষ্টিয়ার কৃতি সন্তান এবং কানাডা প্রবাসী ।

2.01K Shares

আলোচিত খবর

error: কপি করা যাবে না -ধন্যবাদ